শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

 

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী লুৎফুর রহমান : ১৯৪০ থেকে ২০২১



মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম : সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান আর নেই। বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টার দিকে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজেউন )। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮১ বছর।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এডভোকেট মো: লুৎফুর রহমান সিলেটের ওসমানীগর উপজেলার (তৎকালীন বালাগঞ্জ থানা) পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বড়হাজীপুর গ্রামে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

নিজ গ্রামের সরকারী প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে মো: লুৎফুর রহমান মৌলভীবাজার জেলার সরকারী হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে অংকে লেটার মার্কসহ কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন।

তিঁনি ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট এম.সি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং একই কলেজ থেকে আই.এস.সি এবং বিএসসি পরীক্ষা পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এল.এল.বি পাশ করে সিলেট জেলা কোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন লুৎফুর রহমান।

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে তিঁনিসহ আরও কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ পূন:গঠন করেন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। তখন একমাত্র মরহুম ডাক্তার দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ছিলেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ছাত্রলীগ তাঁর নেতৃত্বে আইয়ূব খান বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই বছর হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন লুৎফুর রহমান। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সিলেট থেকে লুৎফুর রহমানের নেতৃত্ব ১০ জন কাউন্সিলর যোগ দেন। পুরান ঢাকার পাকিস্থান মাঠে ছাত্রলীগের ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন শাহ মোজ্জেম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। এই সম্মেলনে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ বিচারপতি ইব্রাহিম সাহেব প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান করেন। এই সম্মেলনে কে.এম উবায়দুর রহমান সভাপতি, সিরাজুল আলম খান সাধারণ সম্পাদক এবং আব্দুর রাজ্জাক সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। তখনকার সামরিক সরকারের শাস্তির ঝুকি মাথায় নিয়ে ছয় দফার লিফলেট বিতরণ করেন তিঁনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেই থেমে থাকেননি জীবনের ঝুকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যান বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদ।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানকে প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন এবং আওয়ামীলীগের প্রার্থী হয়ে তিঁনি বালাগঞ্জ থানা এবং ফেঞ্চুগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

পরবর্তী সময়ে সকল আন্দোলনে যোগদানসহ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের আরও কয়েকজন এমপিএ আসামের করিমগঞ্জ শহরে অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন তিনি। করিমগঞ্জে টাউন হলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী যুবকরা জমায়েত হয়ে তিনিসহ আব্দুল লাতিফ এম.পি.এ টাউন হলের দায়িত্বে ছিলেন এবং যুবকদের খাওয়া দাওয়া এবং কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। এতে করিমগঞ্জের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাঁদের অনেক সাহায্য করেন। এই ক্যাম্প থেকে প্রতি সপ্তাহে গেরিলা ট্রেনিং নেওয়ার জন্য যুবকদের ট্রেনিং কেন্দ্রে পাঠাতেন তাঁরা। দেওয়ান ফরিদ গাজী এম.এন.এর সাথে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান ৩ নং এবং ৪ নং সেক্টরে সিভিল এফ্যায়ার্স সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করেন।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পুনর্বাসন কাজে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান দিন রাত পরিশ্রম করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিঁনি গণপরিষদের সদস্য হন এবং হাতে লেখা সংবিধানে একজন স্বাক্ষর করেন এবং সংবিধান পাশ করায় অংশ গ্রহণ করেন।

১৯৭৫ এর পনেরো আগষ্ট ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পরে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানকে আটক করে তখন অনেক নির্যাতনের শিকার হন তিঁনি।

অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান সিলেট জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব ও পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

সিলেট জেলা আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করতে নিরলস কাজ করেন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। তিনি জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সর্বশেষ সভাপতির দ্বায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টার দিকে মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন