সোমবার, ২১ জুন ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ফেঞ্চুগঞ্জে সেচ্ছায় সড়ক নির্মানে উদ্যমী যুবকদের কথা…



মোঃ দেলওয়ার হোসেন পাপ্পুঃ সরকারি বরাদ্দ নেই। ছিলনা কোন রথি-মহারথিদের সহযোগীতা। এরপরও একটি মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছেন এলাকার কিছু উদ্যমী যুবক। নিজেরাই চাঁদা তুলে, সেচ্ছায় শ্রম দিয়ে শৈশবে পড়ে আসা প্রিয় বিদ্যালয়ের কাঁচা সড়ক নির্মান করছেন তারা। অতি প্রাচীন এই বিদ্যালয়ের ছিল না নিজস্ব কোন রাস্তা। বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে পার্শ্ববর্তী একটি মাজারের পাশ দিয়ে যাতায়ত করতে হয় বিদ্যালয়ের এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। অথচ এই বিদ্যালয়ের পাশে গ্রামের রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকার বিত্তবানরা। কিন্তু এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চলার পথে প্রতিবন্ধকতার দায় তাদের মনে দাগ কাটেনি। দাগ কেটেছে এলাকার তরুন-যুবকদের মনে। তাই নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে আরেকবার প্রমান করলেন “দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”। যেখানে উপজেলার রাস্তাঘাটের বেহাল দশা! যেখানে একের পর এক দূর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে যানবাহন! যেখানে নিরাপত্তাহীন জীবন নিয়ে যাতায়াত করছে উপজেলার জনগন! সেখানে সাহস আর ঐক্যবদ্ধতাই আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমরা সাহসের জাতি! আমরাও পারি! কোন সরকারী বরাদ্দ না পেয়েও স্ব-উদ্যোগে চাঁদা তুলে বাঁশের আঁড় আর মাটি কেটে প্রায় ৪’শ ফুট দৈর্ঘ্য কাঁচা সড়ক নির্মাণ করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো স্থানীয় যুবকরা।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তর্ভক্ত পিঠাইটিকর গ্রাম। ১৯৬৩ সালে হজরত মসরব শাহ (রঃ) মাজারের পাশে বুড়িকিয়ারী বিলের উত্তর তীরে স্থাপিত হয় পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুরু থেকে এই বিদ্যালয়ের ছিলনা নিজস্ব কোন রাস্তা। সুদীর্ঘ ৫৪ বছর এভাবে শিক্ষার্থীরা চরম দূর্ভোগের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে আসছেন। সরকারিভাবে সড়ক নির্মানের জন্য অনেক চেষ্ঠা করেও ব্যর্থ হয়েছেন গ্রামবাসিরা। কালের পরিক্রমায় গ্রামের উদ্যমী যুবক ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র আজম আলী, তাজু, রুজিক, কাসিম, জায়েদ, শিপন ও কামরুলরা জড়ো হয়ে উদ্যোগ নেয় মাটি কেটে রাস্তা নির্মানের। শনিবার (৭ জানুয়ারী) আমার সাথে কথা হয় তাদের। তারা জানায়, প্রথমে নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে বাঁশ কিনে নিজেরা সেচ্ছায় শ্রম দিয়ে মাটি কেটে সড়ক নির্মান কাজ শুরু করে। তারপর এগিয়ে আসেন গ্রামের দেশি ও প্রবাসি বিত্তবানরা। উদ্যমী যুবকরা আরো জানায়, চাঁদার টাকায় আড়ের বাঁশ ও দক্ষ মাটি কাটা লোকের মুজুরীতে লাগানো হচ্ছে আর আমরা সেচ্ছায় মাটির টুকরি মাথায় নিয়ে পরম আনন্দে নির্মান করছি সড়ক। সারাদিনের কর্মব্যাস্ততা শেষে সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত সড়ক নির্মান কাজ শেষে সকলে মিলে ভূণা খিছুড়ী খেয়ে বাড়ী ফিরে যায় যুবকরা। হাতে হাত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রায় লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে প্রায় ৪’শ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭ ফুট প্রস্ত ও গড়ে ৬ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন এই কাঁচা সড়কের কাজ শিঘ্রই সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে এই উদ্যমী তরুণ যুবকরা। ইতিমধ্যে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডে-সিফ্ট শুরু হয় দুপুর ১২ টায়। শনিবার (৭জানুয়ারী) দুপুরে গিয়ে দেখা যায় বিদ্যালয়গামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পরম আনন্দে নির্মানাধীন সড়কের উপর দিয়ে পাঁয়ে হেটে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে, সে যেন এক নয়নাবিরাম দৃশ্য অবলোকন করা যায়, এ সময় উৎফুল্ল আর উচ্ছাসিত ছিল শিক্ষার্থীরা। কথা হয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের সাথে। তিনি জানান, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও উদ্যমী তরুণ যুবকরা নিজের চোখের সামনে এক বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বিদ্যালয়ে মাত্র ২ টি শ্রেণীকক্ষ দিয়ে চলছে পাঠদান আর শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৭৬ জন। বর্তমানে ২ টি শ্রেণীকক্ষ নির্মানাধীন রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানান তিনি। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বাবু জিতেন্দ্র কুমার চন্দ জানান, বিদ্যালয়ে সরকারী উদ্যোগে সড়ক নির্মানের জন্য কত আবেদন করেছি কিন্তু এই বিদ্যালয়ে চাকুরীকালীন ৩৪ বছরে তা আদায় করতে পারিনি যা আমার প্রাক্তন ছাত্ররা সেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বহুল প্রত্যাসিত সড়কটি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। আজ আমি আনন্দিত ও গর্বিত, আমি তাদের সর্বাঙ্গীন সফলতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য সিব্বির আহমদ জানান, সুদীর্ঘ ৫৪ বছরের দূর্ভোগ মোকাবেলায় সরকারিভাবে বাস্তবায়িত না হলেও গ্রামের তরুণ যুবকরা সাহসি ভূমিকা পালন করছে। অর্থ শ্রম ও জমি দিয়ে যারা এই সড়ক নির্মানে এগিয়ে এসেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) জিহান আল তুহিন জানান, সরকারি কোডের (আইডি) সড়ক ব্যাতিত সরকারি বরাদ্ধ পাওয়া যায় না। স্থানীয় যুবকদের এ মহৎ উদ্যোগ অত্যান্ত প্রশংসনীয়। এ রকম কাজ সরকারীভাবে করতে গেলে বিশাল অর্থের প্রয়োজন বলে জানান এলজিইডি’র এই অভিজ্ঞ প্রকৌশলী।

সংবাদটি শেয়ার করুন