সোমবার, ২১ জুন ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ড্রেজিং এর অভাবে নাব্যতা হারাচ্ছে প্রমত্তা নদী কুশিয়ারা



ফরিদ উদ্দিনঃ ড্রেজিং এর অভাবে নাব্যতা হারাচ্ছে প্রমত্তা নদী কুশিয়ারা। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে শাখা নদীগুলোও। এককালের গহীন খরশ্রোতা কুশিয়ারা এখন ‘মরা গাঙে’ পরিণত হওয়ার পথে। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশাল-বিশাল চর ও অসংখ্য ছোট-ছোট ডুবো চর জেগে উঠেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মিঠা পানির প্রায় ৬৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ কম হওয়া সত্ত্বেও নাব্য না থাকায় নৌপরিবহন ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জেনারেল আতাউল গনী ওসমানী মন্ত্রী থাকাবস্থায় বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় নদীর কিছু অংশে ড্রেজিং করেছিলেন। এতে সুফলও পাওয়া গিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একদিকে নদী খননের অভাবে বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। অন্যদিকে হুমকির মুখে রয়েছে সিলেট বিভাগের বৃহত্তর হাওর হাকালুকিসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাওর ও জলাশয়। তাছাড়া কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে যুক্ত নদীগুলো পরিণত হয়েছে ‘মরা খালে’। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাওর এলাকার মানুষ।

কুশিয়ারা নদীর বর্তমান চিত্র এতই করুন যে, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ছোট দ্বীপের অবয়ব নিয়ে কোনো রকম যেন জেগে আছে তার শূন্য বুক। কুশিয়ারা নদী একদিন আপন ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল। ছোট-বড় ডলফিন, শুশুক ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছ যেখানে খেলা করত। উত্থাল স্রোতে চলত পাল তোলা নৌকা। লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজ চলত সারা বছর। ঘাটে-ঘাটে ছিল নৌকার ভিড়। ছিল কুলি-শ্রমিকদের কোলাহল। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে বালাগঞ্জ বাজার, শেরপুর ঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্চ বাজার ছিল সদা কর্মতৎপর সচল নৌবন্দর।

ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ছিল বনিকদের কোলাহলে মুখোর। বিস্তীর্ণ জনপদে কুশিয়ারা নদীর সেচের পানিতে হতো চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল এই কুশিয়ারা। কিন্তু এখন নদীর দিকে থাকানো যায় না। দিন-দিন যেন সংকীর্ণ হয়ে আসছে তার গতিপথ। অথৈই জলের পরিবর্তে কেবল কান্নার সুরই যেন ভেসে আসে কুশিয়ারার বুক থেকে। তাই তো বছরের অধিকাংশ সময় স্রোতহীন অবস্থায় থাকছে কুশিয়ারা।

তাছাড়া বিগত কয়েক বছর ধরে নদীতে চর জেগে ওঠায় প্রভাবশালী মহল বিশেষ বালু ব্যবসায় মেতে ওঠে। আর অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে নদী পারে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন। অথচ সরকারী তদারকিতে পরিকল্পিত ড্রেজিং হলে নদীর তলদেশ ভরাট হত না,বন্যার প্রকোপ মুক্ত হত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৮২২ সালে আসামে চা-শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে চালু করা হয় আসাম-কলকাতা নৌরুট। কলকাতা-করিমগঞ্জ ভায়া প্রায় ১২৮৫ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত কুশিয়ারা নৌপথে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে স্টিমার ও জাহাজ নোঙর করত।

এর মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জ স্টিমার ঘাটে যাত্রা বিরতি ছিল বেশি। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের বরাক নদীর একটি শাখা নদী হচ্ছে কুশিয়ারা। দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার ড্রেজিং না হওয়ায় নদী নাব্য হারাচ্ছে। কুশিয়ারার এ করুন অবস্থায় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অচল হয়ে পড়েছে অনেক ঘাট। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নৌপরিবহনের সঙোগ সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। সেই সঙ্গে কুশিয়ারা নদী তার নিজস্ব গতি হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতি বছর নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছেন কুশিয়ারার তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে মসজিদ-মন্দির, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বসত ভিটা। পরিকল্পিত ড্রেজিং করা গেলে নদী তার প্রান ফিরে পাবে বাড়বে মাছ ও জলজ সম্পদ এমন বক্তব্য সুধীমহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন