মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

কমলালেবুর বাম্পার ফলন, সুদিন ফিরছে সিলেটের কমলা চাষীদের : মোঃ শামস উদ্দিন



সুমিষ্ট রসের ফল কমলা। জনপ্রিয় লেবুজাতীয় এ ফলটির চাহিদা সর্বত্রই। আসছে অক্টোবর-নভেম্বর এ ফলটির ভরা মৌসুম। মৌসুমের এ সময়টায় সিলেটে কমলার ফলন হয় ব্যাপক। সাধারণত শীতের শুরুতেই অর্থাৎ শীত জেঁকে বসার আগের সময়টুকুতেই সিলেটে কমলার ব্যাপক ফলন দেখা যায় এবং শীত পুরোদমে শুরুর আগেই কমলা পাকতে শুরু করে।
উল্লেখ্য যে কমলার মৌসুম বলতে আমরা যা বুঝি সেটা হচ্ছে শীতকাল কিন্তু সিলেটে আগাম ফলন হয় বিধায় শীতের মাসখানেক আগে থেকেও কমলা পাওয়া যায়। আশা করা হচ্ছে এ মৌসুমেও সিলেট অঞ্চলের আঁকা আধাপাকা কমলার কমলার ঘ্রাণে বিমুগ্ধ হবেন ভোজনরসিকেরা।
কমলার বাগানের দৃশ্য খুবই মনমুগ্ধকর। সারি সারি গাছ নিয়ে পড়েছে কমলার ভারে। সবুজ পাতার ফাঁক গলে উঁকি দেয় থোকা থোকা কমলা। সবুজ রঙ্গের কমলার একটু লালচে ভাব আসা মানেই কমলার পাকতে শুরু হওয়া। আবার কোথাও পুরো গাছ জুড়ে পাকা কমলার অপরূপ রূপ।
সিলেটে কমলা উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০০১ সালের শুরুর দিকে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। “বৃহত্তর সিলেট সমন্বিত কমলা চাষ উন্নয়ন” নামে ৮ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পে ৮ হাজারের বেশি কমলার নতুন বাগান করার পরিকল্পনা করা হয়। ২০০১ সালের জুলাই থেকে ২০০৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলে এবং চার জেলায় ২৫০টি বাগান তৈরীর স্থান নির্ধারণ করা হয়। ৫০০০ কমলা চাষীকে বিভিন্ন মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যদিও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নানাবিধ কারণে প্রকল্পটির লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি বাস্তবায়নের সক্ষম হয়নি তবুও প্রণীত প্রকল্পের সুফল হচ্ছে এখনকার কমলা চাষ। বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায় সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে ২৮২ হেক্টর জমিতে বর্তমানে কমলা চাষ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সিলেটে প্রতিবছর কমলার গড় উৎপাদন ৪৭০ মেট্রিক টন।
সিলেট বিভাগের সব জায়গায় কমলার চাষ হয় না।তবে জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, সিলেট জেলার সদর উপজেলা সহ বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল, সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারা বাজার এবং হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার কিছু কিছু টিলা পাহাড় এলাকায় কমলার চাষ হয়।
সব কমলা দেখতে একই রকম গুলগাল ও রসে টইটুম্বুর হলেও স্বাদ আর জাতভেদে রকমফের ও রয়েছে। উৎপাদন এলাকার সঙ্গে কমলার নানা নামকরণও নজর কাড়ে। সুস্বাদু ও সুঘ্রাণের জন্য সিলেটের বিয়ানীবাজারে জলঢুপি কমলার ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তাছাড়া ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি ও বালাট পাহাড়ি এলাকার প্রসিদ্ধ কমলা এখন সিলেটের ছাতকের টিলা-পাহাড় গুলোতে উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ছাতকের কমলা “চেলার কমলা” নামে পরিচিত।
বরাবরের মতো এবারও আশার বাণী দিয়ে শেষ করতে চাই। ২০০৬সালের পর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছিল কমলালেবু , জারা লেবু ও সাতকরার মতো ঐতিহ্যবাহী ফসল। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কমলা, সাতকরা সহ লেবুজাতীয় ফল এর সুদিন ফিরিয়ে আনতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। “লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প”এর আওতায় সিলেট ও মৌলভীবাজারের ৯ টি উপজেলায় কমলা, মাল্টা ও বিভিন্ন জাতের লেবু উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া ৫ বছর মেয়াদী এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে আবারো ফিরে আসবে সিলেটের কমলা চাষীদের সুদিন। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম।
(লেখক পরিচিতি : মোঃ শামস উদ্দিন- ব্যাংকার, সমাজকর্মী, কলাম লেখক)
সংবাদটি শেয়ার করুন