মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জ্ঞানের সমুদ্র সুফি সাধক কবি জালাল উদ্দিন রুমি : সুয়েব আহমেদ



বিশ্ব বিখ্যাত কবি ও সুফিবাদী লেখক জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি আফগানিস্তানের বালখ্ নগরীতে ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সারা বিশ্বে রুমি নামে পরিচিত। তার বাবা বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ ও মা মুইমিনা খাতুন। রুমি একাধারে ছিলেন কবি, আইনজ্ঞ, বিখ্যাত ইসলামিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক ও অতীন্দ্রিবাদী সুফি সাধক। তিনি সাধারণত ফারসি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেছেন। তবে কখনো কখনো তুর্কি, আরবি ও গ্রিক ভাষায়ও লিখতেন। তার রচনাবলি অনুবাদের মাধ্যমে সারা বিশ্বের পাঠকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি হয়ে ওঠেন। ইরান, তুর্কি ও আফগানিস্তান রুমিকে তাদের জাতীয় কবি হিসেবে অভিহিত করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবালসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা লেখক ও ব্যক্তিরা রুমির লেখা দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।

রুমির জন্মস্থান বালখ্ তখনকার সময়ে পার্সি সংস্কৃতি ও সুফিবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। রুমির বাবা বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ ও অতীন্দ্রিবাদী ছিলেন। ১২১৫ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে মঙ্গোলরা যখন এশিয়া মহাদেশ আক্রমণ করে তখন রুমির বাবা ও তার পরিবার এবং অনুসারীরা মিলে পশ্চিমাভিমুখে রওনা হন। অভিযাত্রী কাফেলা দলটি দামেস্ক, মালাত্যেয়া, এরজিকান, শিবাস, কায়সেরি ও নিগদিসহ বিভিন্ন অঞ্চল পাড়ি দেয়। ইরানের নিশাপুর গেলে বিখ্যাত পার্সিয়ান কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের সাথে তাদের দেখা হয়। আত্তার তার দূরদৃষ্টি দ্বারা রুমির প্রতিভা সম্পর্কে বুঝতে পারেন এবং রুমিকে আশীর্বাদ করেন। তিনি যখন দেখলেন রুমি তার বাবার পিছে পিছে হেঁটে যাচ্ছে তখন তিনি মন্তব্য করেন, বিশাল একটি হ্রদের পেছনে একটি সমুদ্র যাচ্ছে।’ এরপর পরিবারটি পবিত্র মক্কা নগরীতে হজ পালন করে এবং বিভিন্ন শহর ঘুরে অবশেষে বর্তমান তুর্কিতে অবস্থিত কোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বাস শুরু করে।

রুমি গওহর খাতুনকে বিয়ে করেন এবং সেই ঘরে তাদের দুই ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ছেলে সুলতান ওয়ালাদ ও দ্বিতীয় ছেলে আলাউদ্দিন চালাবি জন্ম নেয়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হলে রুমি আবার বিয়ে করেন। সেই ঘরে আমির আলিম চালাবি নামে এক পুত্রসন্তান ও মালাখি খাতুন নামে এক কন্যাসন্তান জন্মলাভ করে। রুমি বেশির ভাগ সাহিত্যকর্ম কোনিয়াতেই রচনা করেছেন। পরে তিনি তার বাবার মতো পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। রুমির বয়স যখন ২৫ বছর তখন তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। রুমি মাদরাসা প্রধান হিসেবে তার বাবার পদে স্থলাভিষিক্ত হন। তার বাবার শিষ্য সৈয়দ বুরহান উদ্দিনের কাছে শরিয়াহ, তরিকাহ ও সুফিবাদ শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি মৌলভী হয়ে ওঠেন এবং তার অনুগামীদের শিক্ষা দেন। ব্যক্তিজীবনে রুমি তার বাবার পাশাপাশি পারস্যের কবি আত্তার ও সানাইয়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আত্তার হচ্ছেন আত্মা, সানাই তার চোখ জোড়া/এবং সময়ের পরে সময়, একই ট্রেনে এসেছি মোরা।’

১২৪৪ সালের এক দিনে দরবেশ শামস তাবরিজির সাথে দেখা হওয়ার পর রুমির জীবন পুরোপুরিভাবে বদলে যায়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক ও আইনজ্ঞ থেকে রুমি একজন সাধুতে রূপান্তরিত হন। শামস একজন সঙ্গী খুঁজছিলেন যে তাকে সঙ্গ দিতে পারবে। এ কথা শুনে রুমি তাকে জিজ্ঞেস করেন বিনিময়ে শামস তাকে কী দেবে? শামস বললেন তার শির। তার পর রুমি বলেন, তুমি যাকে খুঁজছ সে কোনিয়ার জালাল উদ্দিন রুমি। রুমি শামসের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। শামসের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিবাদী হয়ে ওঠেন।

১২৪৮ সালের এক রাতে রুমি ও শামস একত্রে বসে কথা বলছিলেন। ওই মুহূর্তে পেছনের দরজা দিয়ে কেউ শামসকে ডাক দেয়। শামস সেই ডাকে সাড়া দেন এবং তিনি আর কখনো ফিরে আসেননি। শামসের শূন্যতা রুমিকে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দেয়।

পরে রুমির সঙ্গী ছিলেন সালাউদ্দিন জারকুব। যিনি পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। সালাউদ্দিনের মৃত্যুর পর রুমির লিপিকার এবং তার প্রিয় শিষ্য হুসাম চালাবি রুমিকে সঙ্গ দেন। একদিন তারা দু’জনে হাঁটছিলেন এবং হুসাম রুমিকে সানাইয়ের ‘এলাহিনামা’ ও আত্তার এর ‘মাতিক উত-তাইর’ গ্রন্থের আদলে একটি বই রচনা করতে বলেন। রুমি মুচকি হাসেন এবং সাথে সাথে একটি কাগজে প্রথম আঠারো লাইন লিখে ফেলেন। এভাবেই রুমির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মসনবী’ সৃষ্টির কাজ শুরু হয়। হুসাম রুমিকে আরো বেশি বেশি লিখতে উৎসাহ দিতে থাকেন। রুমি পরবর্তী ১২ বছর ধরে ছয় খণ্ডে রচিত ‘মসনবী’ রচনার কাজে নিয়োজিত থাকেন। এটি রুমির লেখা সেরা রচনাগুলোর মধ্যে একটি যা তিনি তার প্রিয় শিষ্য হুসাম চালাবিকে উৎসর্গ করেন। এ ছাড়াও রুমি অসংখ্য রুবাইয়াৎ ও গজল লিখেছেন।

কবিতার পাশাপাশি রুমির বেশ কিছু বক্তব্য তার সঙ্গী ও অনুসারীদের দ্বারা লিপিবদ্ধ আকারে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ফি মা ফি’ গ্রন্থে বিভিন্ন সময়ে দেয়া তার প্রায় একাত্তরটি বক্তব্য স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও ‘মজলিস-এ সভা’ গ্রন্থে রয়েছে বিভিন্ন সভায় রাখা রুমির সাতটি বক্তব্য। ‘মাকাতিব’ এ রয়েছে তার ছাত্র, পরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ ও অন্য ব্যক্তিদের কাছে লেখা বেশ কিছু চিঠিপত্র।

১২৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে রুমি অসুস্থতাবোধ করতে থাকেন। অসুস্থাবস্থায় রুমি নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছেন এবং বেশ কিছু গজল ও কবিতা লিখেছেন। ১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে তুর্কির কোনিয়ায় বিখ্যাত এই কবি মৃত্যুবরণ করেন। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান প্রায় এক মাসব্যাপী দীর্ঘ হয়েছিল এবং সেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি, তুর্কি ও গ্রিকসহ প্রায় সব ধর্মের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রুমির শবদেহের পাশে তারা সবাই নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন। তাকে তার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। রুমির কবরের এপিটাফটিতে উজ্জ্বল হরফে লেখা রয়েছে, ‘যখন আমি মৃত, তখন আমাকে আমার সমাধিতে না খুঁজে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।’

রুমির অন্যতম বন্ধু জর্জিয়ার রানী গুরসু খাতুনের তহবিলের দ্বারা রুমির সমাধিস্থলে মাওলানা মিউজিয়াম নির্মাণ করা হয়। সেখানে মসজিদ, নৃত্যশালা, বিদ্যালয়, বিখ্যাত মৌলভী ব্যক্তিদের কবর ও দরবেশদের থাকার জায়গা রয়েছে। আজো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিম ও অমুসলিমরা জালাল উদ্দিন রুমির স্মরণে তার সমাধিস্থলে ছুটে যান।

( লেখক পরিচিতি : আইনজীবী, সমাজকর্মী, কলামিস্ট ও রাজনীতিক )
সংবাদটি শেয়ার করুন