শনিবার, ৬ মার্চ ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এ কি অপরুপ রুপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী : সুষমা সুলতানা রুহি



প্রাকৃতিক অপরুপ রুপ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ আমার জন্মভূমি প্রিয় বাংলাদেশ। চারিদিকে নীল ও সবুজ রং এর হাতছানি। আশা করি এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। তাইতো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গেছেন “সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।” বাংলাদেশের কিছু কিছু দর্শনীয় স্থান ছাড়াও সৌভাগ্য হয়েছে পৃথিবীর দুইটি দেশ ইংল্যান্ড ও ভারত ভ্রমন করার। এই দুটি দেশের মধ্যে ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ছিলো সপ্তম বারের মত ভ্রমন- তাই ইংল্যান্ডের প্রায় দর্শনীয় স্থান গুলো দেখা হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের ভ্রমণ কালে যে দিকটি লক্ষ্য করেছি তা হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চাইতে তাদের মানুষের তৈরী স্থাপনাগুলো বেশী নান্দনিক ও আকর্ষনীয়। সুন্দর ও পরিপাটি একটি দেশ। সব কিছু নিয়ম শৃংখলার ভিতরে চলে। কোথাও লাইনে দাঁড়ালে পিছনের কেউ ধাক্কাধাক্কি করে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেননা বা ট্রেনে বাসে উঠার সময় সাহায্য চাইতে হয়না একজন আরেকজনকে-লাগেইজ বা ব্যাগ তুলতে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। যে কোনো বিপদে ৯৯৯ কল দিলেই পুলিশ হাজির আপনার সমস্যা সমাধানের জন্য। রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিছন্ন। গাড়িতে চড়লে এবং সামনে বসলে বাধ্যতামূলক সিটবেল্ট লাগাতে হবে। যা যা নিয়ম বা আইন সবই সে দেশের নাগরিকের সুবিধা, নিরাপত্তা ও ভালর জন্য এবং সবাই সে নিময়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সব মিলিয়ে শান্তির একটা দেশ হলো বৃটেন।
এবার বলি ভারতের কথা। ভারত একটি মহা রাষ্ট্র, বিশাল তার পরিধি। এক রাইটার লিখেছিলেন- যে পুরো ভারত ভ্রমন করেছে সে সারা পৃথিবী ভ্রমনের স্বাদ পেয়েছে। আমি ভারতের দুটি জায়গা দেখেছি কলিকাতা ও দিল্লী। ২০১৬ সালে প্রথমে বেনাপুল হয়ে কলিকাতা প্রবেশ করি। সেখানে দুইদিন থাকি এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখি পরে দীর্ঘ যাত্রা পথ রাজধানী এক্সপ্রেসে (ট্রেনে) দিল্লী রওয়ানা দেই। দীর্ঘ এ যাত্রা পথে যেতে যেতে যা লক্ষ্য করলাম তা হতাশাজনক।
তখন বছরের সময়টা ছিলো মার্চ বা এপ্রিল। গরমকাল। প্রাকৃতিক সবুজের ছোয়া খুবই কম। রৌদ্রের তাপে পাহাড়ের মাটি কালো হয়ে গিয়েছিলো। মাইলের পর মাইল বিরান মরুভূমির মতো। মাঝে মাঝে দুই একটা গাছ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে টিকে রয়েছিলো। যারা চাষী তারা এ গাছগুলোর পাশে ছোট ছোট ছাউনি তৈরী করেছেন বিশ্রামের জন্য। যাই হোক এক রাত এক দিন পরে অামরা হাজির হলাম দিল্লী। দিল্লী যাওয়ার একটাই ইচ্ছা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য্য তাজমহল দেখার। আমাদের চারজনের টিম ছিলো এবং সবাই নারী। দিল্লীতে আমরা একটা হোটেলে উঠলাম এবং রাত তিনটায় একটি টেক্সি ভাড়া করে আগ্রার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সেখানে পৌছলাম সকাল ছয়টায়। গরম কালে সকালবেলাটা তাজমহল ঘুরে দেখার উত্তম সময়। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় তাজমহলের রুপ উপভোগ করলাম পরে এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে আর্গ্রা ফোর্ট দেখতে গেলাম।
রাজার বাড়ি বলে কথা আর্গ্রা ফোর্ট ঘুরে দেখা বা ইতিহাস জানার জন্য একজন গাইডের আশ্রয় নিলাম। কি বলবো আমার মনে হয়েছে তাজমহল থেকেও আমি অভিভূত হয়েছি লাল কেল্লার বিশালতা, রাজকীয়তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য জেনে ও দেখে। পরে আমরা কুতুব মিনার ও ইন্ডিয়া গেইট দেখে আমাদের আগ্রা ও দিল্লীর ভ্রমন শেষ করে পরের দিন আবার কলিকাতার উদ্যেশ্যে রওয়ানা হই। ভারতের এ দু’জায়গা ভ্রমনকালীন সময়ে যা খেয়াল করলাম, যদিও তারা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ তার পরেও তারা আমাদের চেয়ে নিয়ম শৃঙ্খলায় অনেকটাই এগিয়ে এবং তাদের ঐতিহাসিক স্হাপনাগুলো দেখার মতো। এই স্হাপনাগুলো ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে যা আমাকে বেশী আকৃষ্ট করেছে।
আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশও অতীত ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ কম নয়। প্রাকৃতিক রুপ বৈচিত্রের তো তুলনা-ই নেই। আমাদের সবই আছে শুধু একটি বিষয়ের বড় অভাব যা আমাকে ভীষণ ভাবে কষ্ট দেয়। আমি ২০১৮ সাল থেকে ভোরে সাইকেলিং করি যার কারণে সিলেটের অলিগলি থেকে শুরু করে চা বাগান বা চা বাগানের গহীনে গিয়েও বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি। নদীর পার ঘেষে রাইড দিয়েছি। মোট কথা বন বাদাড়, আমার সব জানা। যেখানেই যাই আমি আমার মোবাইলের ক্যামেরায় প্রাকৃতিক সুন্দর দৃশ্য ধারণ করতে ভুল করিনা। তবে দুঃখের বিষয় হলো আমার দেশ সুন্দর কিন্ত আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের এ প্রিয় ভূখন্ডটা সুন্দর রাখার মোটেই ইচ্ছা নেই। তারা সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য অস্হির কিন্ত সেই জায়গায় চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা , টিস্যু , পলিথিন ফেলে নোংড়া করে আসতেে দ্বিধাবোধ করেন না। আমি যখন কোনো সুন্দর জায়গার ছবি তুলি তখন সতর্কতার সহিত তুলি যাতে এ বিশ্রী জিনিষগুলো ক্যামেরার ফ্রেমে না ডুকে তাই অনেকেই আমার ছবি দেখে মন্তব্য করেন আপা এতো সুন্দর জায়গা আপনি কোথায় পান!?
জানি আমাদের দেশ প্রেমের অভাব নেই। রয়েছে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করার গৌরবময় ইতিহাস। সেই সে জাতি আমরা, তাহলে কেনো অামরা পারিনা আমাদের স্বর্গতুল্য দেশটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে? অল্প বৃষ্টি হলেই পানিতে ড্রেন ভরে রাস্তা ডুবে যায়। একটাই কারণ ড্রেন হাবিজাবি,বোতল চিপ্সের প্যাকেটে ভর্তি তাই পানি কাটতে পারেনা। অনেকেই যে সরকার ক্ষমতায় থাকেন তার উপর দোষ চাপিয়ে গালাগাল করেন। তাই আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন আআর কত এমন দোষ চাপাচাপি? এ সব থেকে কি অামাদের বেরিয়ে আসা উচিত নয়? মনে রাখবেন যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একদিন লজ্জিত হতে হবে।
তাই আসুন এ দেশটা আমার আপনার, সবার। আমাদেরই দ্বায়িত্ব এ দেশ পরিষ্কার পরিছন্ন রাখার এবং বিশ্বের দরবারে নিজেদের সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে পরিচিত করার।

( সুষমা সুলতানা রুহি : সিলেট জেলা পরিষদের সদস্য, সমাজকর্মী ও নারী নেত্রী )

সংবাদটি শেয়ার করুন